Prottashitoalo

‘লকডাউন’ দেওয়ার কারণে পুরুষ শূন্য সালথার ৭০ গ্রাম

0 20

সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ফরিদপুরের সালথায় ‘লকডাউন’ না মানাকে কেন্দ্র করে তাণ্ডবের ঘটনার পর পুলিশের জোরদার অভিযানের কারণে উপজেলার ১০৭ টি গ্রামের ৬০ থেকে ৭০টি গ্রাম প্রায় পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উপজেলা সদরের রামকান্তপুর ইউনিয়ন, সোনাপুর ইউনিয়ন, ভাওয়াল ইউনিয়ন ও গট্টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রামে এখন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নেই বললেই চলে।

রোববার সকালে সালথা বাজারের গিয়ে দেখা যায়, এদিন সাপ্তাহিক হাট হওয়ায় বিভিন্ন গ্রামের নারীরা পেঁয়াজ, পাটসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করছেন।

এছাড়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সালথা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, নারী ও শিশু ছাড়া আর কেউ বাড়িতে নেই। এ সময় বাড়ির নারী ও শিশুদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ দেখা গেছে। তারা বাইরের মানুষ দেখলেই ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন।

যেখান থেকে ঘটনা শুরু সেই ফুকরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানের সবগুলো দোকান বন্ধ রয়েছে। এ সময় কথা হয় হাসি বেগমের সাথে,

তিনি বলেন, সব সময় ভয়ে আছি। পুলিশ দেখতে দেখতে সারাদিন কেটে যায়। বাড়িতে কোন পুরুষ লোক নেই। সবাই গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে রয়েছে।

মিলি আক্তার নামে একজন জানান, করোনা মোকাবিলায় কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করতে দুই আনসার সদস্য ও ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়ে সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামণি ফুকরা বাজারে গেলে মানুষের জটলা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলায় হামলা হয়েছে।

সালথার বাসিন্দা মারুফা নামে একজন জানান, সালথা গ্রাম উপজেলা সদরে হওয়ায় এলাকার বাড়িগুলোতে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। ঘটনার পর থেকে ওই সব এলাকার লোকজন গ্রেপ্তার আতঙ্কে পলাতক অবস্থায় রয়েছে।

রামকান্তপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মোল্যা জানান, ঘটনার সময় রামকান্তপুরের যোবায়ের নামে এক ব্যক্তি মারা যাওয়ায় এলাকাটিতে সবসময় পুলিশ আশা যাওয়া করছে। যে কারণে গ্রেপ্তার আতঙ্কে এই গ্রামের কোন পুরুষ লোক বাড়িতে নেই ।

শৌলডুবি গ্রামের মালেকা বেগম বলেন, আমার স্বামী গ্রামে খেতে কাজ করেন। তিনিও বাড়িতে থাকার সাহস পাননা। যুবক ছেলেকে আগেই বাইরে আত্মীয়র বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন আমাদের জমিতে পাট রয়েছে সেগুলো কে দেখাশুনা করবে?

জানা যায়, সালথা উপজেলায় ১৬৫টি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। ফরিদপুর জেলার শাখার হেফাজত ইসলামের আমীর ও সাধারন সম্পাদকের বাড়ি এই সালথাতেই। ওই রাতে হেফাজত ইসলামের আমীর ও বাহিরদিয়া মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা আকরাম আলীকে গ্রেপ্তারের গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উস্কে দেয়া হয়েছিল। এখন এসব এলাকার আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মাঝেও উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কাজ করছে।

নগরকান্দা ও সালথা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সুমিউর রহমান বলেন, সালথায় সহিংসতার ঘটনায় রোববার সন্ধা পর্যন্ত এরই মধ্যে ৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরো জানান, সালথায় তাণ্ডবের পর থেকে ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মামলার আসামিদের ধরতে পুলিশ দিনরাত জোরদার অভিযান চালানো হচ্ছে। এই ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা পুলিশ গ্রহণ করবে। এই ব্যাপারে কোন রকমের ছাড় দেয়া হবে না।

উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় করোনা মোকাবিলায় কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করতে দুই আনসার সদস্য ও ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়ে সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামণি ফুকরা বাজারে যান। সেখানে তিনি যাওয়ার পর মানুষের জটলা সৃষ্টি হয়।

এ অবস্থায় তিনি ওই স্থান থেকে ফিরে আসেন এবং সেখানে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পাঠান। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত জনতা এসআই মিজানুর রহমানের ওপর হামলা চালান।

এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে স্থানীয় জনতা পুলিশের গুলিতে দুইজন নিহত ও বাহিরদিয়া মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা আকরাম আলী এবং জনৈক আরেক মাওলানার গ্রেপ্তারের গুজব ছড়িয়ে দেয়। গুজবে কান দিয়ে হাজারো মানুষ এসে থানা ঘেরাও করে। সেই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ, থানা, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, উপজেলা কৃষি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া সালথায় কর্মরত এক সাংবাদিকের মোটর সাইকেলে আগুন দিয়ে ভাঙচুর করা হয়। সালথা উপজেলা সদর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ হামলায় পুলিশের আট সদস্যসহ আহত হন ২০ জন। আহতদের মধ্যে জুবায়ের হোসেন (২৫) ও মিরান মোল্যা (৩৫) নামের দুই যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

web site
Comments
Loading...